সিনেমা-সিরিজ দেখে ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা

0
4

বিনোদনের অন্যতম প্রভাবশালী মাধ্যম সিনেমা-সিরিজ দেখে ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা।

শিক্ষার অন্যতম এই উপকরণ সুশিক্ষায় কাজে না লাগিয়ে ব্যবহার হচ্ছে কুশিক্ষায়। সিনেমার ‘অ্যাকশন’, ‘ক্রাইম’ ও ‘অ্যাডভেঞ্চার’ থেকে প্রভাবিত হয়ে বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগের চেষ্টা করছে উঠতি বয়সী তরুণরা।

সম্প্রতি ১৫৪ বার একটি সিনেমা দেখে ব্যাংক ডাকাতির চেষ্টা এবং ভারতীয় সন্ত্রাসী পরিচয়ে চাঁদা দাবির ঘটনা ঘটেছে। এ দুই ঘটনা ঘটিয়েছে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সের দুই কিশোর।

যারা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, সিনেমা-সিরিজ দেখে কিভাবে তারা অপরাধের নানা কৌশল রপ্ত করে। পুলিশ বলছে, চাঞ্চল্যকর এ দুটি ঘটনা সামনে এলেও এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে যা আলোচনায় আসছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতীয় টিভি সিরিজ ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে দেশে গত দুই বছরে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ঘটেছে।

এরমধ্যে রয়েছে- গত বছরের অক্টোবরে সাতক্ষীরায় ছোট ভাইয়ের হাতে দুই সন্তান ও স্ত্রীসহ বড় ভাই হত্যাকাণ্ড, একই মাসে চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে আলোচিত জোড়া খুন (মা-ছেলেকে), ২০১৯ সালের জুনে পিরোজপুরের ইন্দুরকানিতে ১৩ বছরের এক কিশোরকে অপহরণ করে হত্যা, একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের আকবর শাহ এলাকায় টাকা না পেয়ে ভাবিকে হত্যা।

এছাড়া ২০১৯ সালের মার্চে কেরানীগঞ্জে এবং এপ্রিলে সাভারের ভাকুর্তায় দুই রিকশাচালকের হত্যাকাণ্ড। এই ঘটনাগুলোয় জড়িতদের বেশিরভাগই কৈশোর বয়স অতিক্রম করেছে।

কিন্তু সম্প্রতি বগুড়া ও রাজধানীর চাঞ্চল্যকর দুটি ঘটনায় জড়িত ছিল কিশোররা।

অতীতে শুধু ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে অপরাধে জড়ানোর খবর এলেও এবার হয়েছে হিন্দি সিনেমা দেখে। বগুড়ায় গত মাসে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর হিন্দি সিনেমা ‘ধুম-৩’ ১৫৪ বার দেখে ‘ফিল্মি স্টাইলে’ ব্যাংক ডাকাতির চেষ্টা করে।

সে আমির খানের অভিনয়ের নানা কৌশল ও ‘অ্যাকশন’ বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে চায়। ডাকাতির চেষ্টাকালে ব্যবহার করে বিশেষ ‘রুফটপ গ্লাভস’।

তালা কাঁটতে ব্যবহার করে বিশেষ কাটার। মুখোশ পরা এই কিশোরের ছোড়া দাহ্য পদার্থ ও ছুরিকাঘাতে দুই আনসার সদস্য আহত হন। ডাকাতির এসব ‘আইডিয়া’ সে সিনেমাটি দেখেই রপ্ত করেছে বলে জানায়।

এই কিশোর অপরাধীকে আটকের পর বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ বলেন, সিনেমা ও ডার্ক ওয়েব জগতে ঘোরাফেরা করা এই কিশোর একজন পেশাদার অপরাধীর চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল।

২৭ জানুয়ারি ভারতীয় সন্ত্রাসী পরিচয়ে গাড়িতে নকল বোমা পুঁতে রেখে চাঁদা দাবির অভিযোগে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

এই কিশোর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এক ব্যবসায়ীর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। কথা না শুনলে বোমা মেরে তার পরিবারের সদস্যদের উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়।

পরদিন ব্যবসায়ী তার প্রাইভেটকারটির নিচে বোমাসদৃশ বস্তু দেখতে পান। পরে পুলিশ বস্তুটি অপসারণ ও ধ্বংস করে। আটক করা হয় ওই কিশোরকে।

জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, হিন্দি সিনেমা ও সিরিজ দেখে নকল বোমা বানানো এবং সন্ত্রাসী পরিচয়ে হুমকি দেওয়ার কৌশল শিখে সে।

আয়ত্ত করে হিন্দি ভাষা। দ্রুত ধনী হওয়ার আশায় দুই মাস ধরে সে এই পরিকল্পনা করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি) একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, সিনেমা-সিরিজ ও ক্রাইম পেট্রোলোর মতো অনুষ্ঠান দেখে এবং ফ্যান্টাসি থেকে কিশোররা অপরাধে জড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, ভারতীয় সন্ত্রাসী পরিচয়ে চাঁদা দাবি- এটাতো একটা ঘটনা। এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, যা সেভাবে আলোচনায় আসে না।

সমাজ, পরিবার, শিক্ষা ও চারপাশ-কিশোরদের এ অবস্থা তৈরির কারণ। এদের ধরলে মুখও দেখানো যায় না। কারণ ১৮ বছরের কম বয়সী এই কিশোরদের চেহারা দেখানোর সুযোগ নেই।

আমরা মিডিয়াতে ঘটনাগুলো এজন্যই বলি, যাতে একটি ঘটনা দেখে অন্যরা অপরাধ সংঘটনে নিরুৎসাহিত হয়।

বাচ্চারা যাতে ভুল পথে পা না বাড়ায়। এই ধরনের অপরাধ দমনে পরিবারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট-এর সহযোগী অধ্যাপক আহমেদ হেলাল বলেন, কিশোর অপরাধগুলোর একটা বড় কারণ ‘অবজারভেশনাল লার্নিং’।

তার আশপাশের যে পরিবেশ ও প্রতিবেশ আছে সেখান থেকে সে যে বিষয়গুলো দেখে, তা থেকে সে তার চিন্তা ও আচরণের কিছু উপাদান জোগাড় করে।

যেই জায়গাগুলো থেকে তারা দেখে শিখছে, সেই জায়গাগুলোয় দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, সিনেমা সিরিয়াল যারা দেখে সবার ওপর এর প্রভাব পড়ে না, এটা যেমন সত্য, তেমনি সিনেমা সিরিয়ালও কিশোরবান্ধব অর্থাৎ বিকাশবান্ধব হওয়া উচিত।

আমাদের অভিভাবকদের একটু প্রযুক্তি সচেতন হতে হবে। শিশু-কিশোরদের কোন সিনেমা দেখানো যাবে, কোনটা যাবে না এগুলো বুঝতে হবে। এই বিষয়গুলো অভিভাবকদের নজরদারিতে রাখা উচিত।

এসবের বাইরে কিশোর অপরাধের উৎপত্তির অন্যতম কারণ ‘গেমিং অ্যাডিকশন’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৮ সালের জুনে এই বিষয়টিকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

দেশে অনলাইন গেম, মুঠোফোন, কম্পিউটার বা ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে কিশোররা বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

সম্প্রতি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে অপরাধ প্রবণতার বেশ কিছু খবর এসেছে। এই আসক্তি একজন কিশোরকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

এর প্রভাব বিবেচনায় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রাণঘাতী ব্লু-হোয়েল, মোমো ও গ্র্যানি গেম খেলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার ইউনিট।

এ বিষয়ে আহমেদ হেলাল বলেন, বিশ্বজুড়ে এ বিষয় নিয়ে প্রকাশিত ১৬টি গবেষণাপত্রের মেটা অ্যানালাইসিস করে দেখা গেছে, কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে চার দশমিক ছয় শতাংশ ইন্টারনেট গেমিং আসক্তিতে ভুগছে।

ইন্টারনেট বা গেমের বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে আচরণ পরিবর্তিত হয়ে যায়। আগ্রাসী ভাব দেখা দেয়। অল্পতেই সে রেগে যায়।

কখনও নিজের মধ্যে আÍহত্যার প্রবণতা বা অপরকে আঘাত অথবা হত্যা করার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। এটি মাদকাসক্তির মতোই একটি সমস্যা।

এই সমস্যা প্রতিরোধে মা-বাবার সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here